খুলনা বিভাগে সরকারি হাসপাতালগুলোর অর্ধেক পদই শূন্য

খুলনা সিভিল সার্জন নিয়ন্ত্রিন ১১৩টি পদ খালী
২য় থেকে ৪র্থ শ্রেনী পদ শুন্য রয়েছে ৫৪৭টি

কামরুল হোসেন মনি : মানুষের রোগ নির্নয়ে গুরুত্বপুর্ণ শাখা ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি। রোগীর সঠিক চিকিৎসনা নিশ্চিত করতে প্রধান শর্ত ওটি। সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগ নির্ণয়ের যাবতীয় মেশিনারীজ থাকলেও চিকিৎসক সংকট থাকায় সেই সেবা থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্ঝিত হচ্ছে। এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে এক শ্রেনী অসাধু ক্লিনিক ও প্যাথলজি ব্যবসায়ীরা স্বাস্থ্য সেবার নামে স্বাস্থ্য বাণিজ্য নেমে পড়েছেন। খুলনা বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডাক্তারের মঞ্জুরীকৃত ১ হাজার ৮২১টি পদের মধ্যে ৯৬৭টি পদ এখনো পুরন হয়নি। এর মধ্যে খুলনা সিভিল সার্জন নিয়ন্ত্রিত হাসপাতালগুলোতে ডাক্তারের অনুমোদিত ২৪১ পদের মধ্যে ১১৩টি পদ শূণ্য রয়েছে। এছাড়া ২য় থেকে চতুর্থ শ্রেনীতে ১ হাজার ৯৬২টি পদের মধ্যে ১১৩টি পদ শূণ্য রয়েছে। ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগের রিপোর্ট অনুযায়ী ওই সব পদগুলো খালি রয়েছে বলে একটি সূত্র জানায়।
এ ব্যাপারে খুলনা বিভাগের পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডাঃ মোঃ রওশন আনোয়ার এ প্রতিবেদককে বলেন, বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতে মঞ্জুরীকৃত পদের বিপরীতে অর্ধেকের বেশি পদ খালি রয়েছে স্বীকার করে বলেন, অনেক হাসপাতালে ডাক্তাররা চাকুরি থেকে অবসরে গেছেন। এছাড়া ডাক্তারি পাস করে বের হয়ে আসতে সময়েরও ব্যাপার রয়েছে। বর্তমান সরকার স্বাস্থ্যখাতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন উল্লেখ করে বলেন, যত দ্রুত সম্ভব আমরা ওই সব শুন্য পদে চিকিৎসক দিতে পারি সেই চেষ্টায় আছি।
খুলনা স্বাস্থ্য বিভাগের সূত্র মতে, ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত খুলনা বিভাগের ১০ জেলাসহ মোট ডাক্তারের ১ হাজার ৮২১ টি মঞ্জুরীকৃত পদের সংখ্যা রয়েছে। এর মধ্যে এখনো পর্যন্ত চিকিৎসকদের শূন্য পদের সংখ্যা রয়েছে ৯৬৭টি। এর মধ্যে খুলনায় চিকিৎসক পদের শূণ্য রয়েছে ১০৯টি, বাগেরহাটে ১৩৬টি, সাতক্ষীরায় ১২৯টি, যশোরে ১২৩টি, ঝিনাইদহে ১৩৮টি, মাগুরায় ৬৩টি, নড়াইলে ৭৪টি, কুষ্টিয়ায় ৮৪টি, চুয়াডাঙ্গায় ৩৯টি ও মেহেরপুরে ৬৬টি পদ খালি রয়েছে। সূত্র মতে, খুলনা সিভিল সার্জন নিয়ন্ত্রিত মহানগরী ও জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডাক্তারের ২৪১টি মঞ্জুরীকৃত পদের বিপরীতে ১২৮টি পদ পূরন হয়েছে। বাকি গুলোতে এখনো চিকিৎসক পদ শূণ্য রয়েছে। সদর হাসপাতালে প্যাথলজি বিভাগে মানুষের রোগ র্নিণয়ের জন্য উন্নত মানের মেশিনারিজ স্থাপন করা হলেও শুধুমাত্র চিকিৎসক না থাকায় সেই সেবা থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্ঝিত হচ্ছে। এছাড়া ব্যবহৃত না হওয়ার কারণে যন্ত্রটি যে কোন মুহুর্তে নষ্ট হওয়ার আশংকা রয়েছে।
জানা গেছে, খুলনা ৯ উপজেলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে ফুলতলায় ডাক্তারের অনুমোদিত ২৫টি মধ্যে ১২টি পদ শূণ্য রয়েছে। একইভাবে দিঘলিয়ায় ৭টি, তেরখাদায় ৫টি, দাকোপে ২৩টি, ডুমুরিয়ায় ১৫টি, বটিয়াঘাটায় ৪টি, রূপসায় ৭টি, কয়রায় ৯টি ও পাইকগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৩টি চিকিৎসক পদ শূন্য রয়েছে।
এ ব্যাপারে সিভিল সার্জন ডাঃ এ এস এম আব্দুর রাজ্জাক এ প্রতিবেদককে বলেন, হাসপাতালে রোগীদের রোগ নির্ণয়ের জন্য উন্নতমানের মেশিনারিজ রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ বছর ধরে রেডিওলোজিষ্ট পদে চিকিৎসক পদ শূণ্য রয়েছে। আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছি। কিন্তু ওই পদে চিকিৎসক স্বল্পতা থাকার কারনে তা সহজে পুরন করা সম্ভব হচ্ছে না। কবে আসবে তাও সঠিক কোন জানা নেই।
জানা গেছে, খুলনা জেলায় অধিকাংশ হাসপাতাল,  ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার চলছে নামসর্বস্ব ডিগ্রিধারীদের দিয়ে। কখনো কখনো হাসপাতালে কাজের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করেই চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং রিপোর্ট তৈরির কাজ। বিশেষজ্ঞ ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্টের অভাবে এসব চিকিৎসালয়ে সঠিক রিপোর্ট যেমন তৈরি হচ্ছে না, তেমনি নিম্নমান এমনকি ভুল রিপোর্ট দিয়ে চিকিৎসা করাতে গিয়ে খেসারত দিতে হচ্ছে রোগীদের। এ ঘটনায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী একাধিবার অভিযান পরিচালনা করে সত্যতা খুজে পেয়েছেন। দোষীদের আইনের আওতায় এনেছেন। পরে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন স্বাস্থ্য সেবা নামে অসাধু ব্যবসায়ীরা।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের প্রতিটি সরকারি বড় হাসপাতালসহ বিভিন্ন বেসরকারি মেডিকেল, ক্লিনিক ও ডায়গনস্টিক সেন্টারে প্রতিদিন মানুষ রোগ নির্ণয়ের জন্য আসছে। এ কারণেই একজন ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিশেষজ্ঞকে হিস্টোপ্যাথলজি ছাড়াও হাসপাতালের জরুরি সকল প্যাথলজিক্যাল টেস্ট তৈরি করার জন্য এ বিষয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি প্র্যাকটিক্যাল অভিজ্ঞতার দক্ষতার প্রয়োজন আছে। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল প্যাথলোজি (ল্যাবরেটরি মেডিসিন) বিভাগ থাকলেও বিশেষজ্ঞ জনবল খুবই কম।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, খুলনায় সর্বত্র ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে ওঠা এসব মেডিকেল, ক্লিনিক, ডায়গনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিগুলোতে প্রাায় সময়ই ডিপ্লোমাধারী ব্যক্তি দিয়ে বা শুধুমাত্র অভিজ্ঞতার জোরে গুরত্বপূর্ণ মেডিকেল রিপোর্ট প্রদান করা হয়। ঝকেঝকে টাইলস মার্বেল পাথর বসানো ভবন, দামি ডেকোরেশন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ওয়ার্ড দেখিয়ে সার্ভিস চার্জের নামে গলাকাটা ফি আদায় করে রোগীদের নিকট থেকে। কিন্তু সেসব প্রতিষ্ঠানে মানসম্পন্ন রিপোর্ট তৈরির জন্য ল্যাবরেটরি মেডিসিনের ওপর কোনো বিশেষজ্ঞ ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট ও প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই  নেই। যা সম্প্রতি আইন শৃঙ্খলাবাহিনী অভিযান চালিয়ে এর সত্যতা খুজে পান।

আপনার মতামত জানানঃ